গোপালগঞ্জ জেলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

রবীন্দ্র নাথ অধিকারী

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যঃ বিচিত্র মনীষা ও লোকজ-সংস্কৃতির সমাবেশে গোপালগঞ্জ এক ঋদ্ধ-জনপদ। মধুমতি বিধৌত এই জনপদের রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ইতিহাস-ঐতিহ্যের ঔজ্জ্বল্যে দেশীয় পরিমণ্ডলের বাইরেও গোপালগঞ্জের রয়েছে একটি পরিচিতি। রয়েছে গুরুত্ব। গোপালগঞ্জ হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মধন্য পূণ্য ভূমি। জেলার সবচেয়ে প্রাচীন জনপদ হচ্ছে কোটালীপাড়া। প্রাচীন বাংলার জনপদ সমূহের মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতি, রাজশাহীর পাহাড়পুর ও বগুড়ার মহাস্থানগড়ের মতো কোটালীপাড়া একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। চীনা পরিব্রাজক য়্যুয়ান চুয়াই, মনসা মঙ্গলের কবি বিজয় গুপ্ত, ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার ও ড. নীহার রঞ্জন রায়ের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে কোটালীপাড়াকে প্রাচীন বাংলার অতীত সভ্যতাম--ত একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ড. নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে ষষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে কোটালীপাড়ায় ‘চন্দ্রবর্মন কোট’ নামের একটি দূর্গ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ‘চন্দ্রবর্মন কোট’ নাম থেকেই কোটালীপাড়া নামের উৎপত্তি। কোটালীপাড়া অঞ্চল ষষ্ঠ শতকের একাধিক তাম্রপট্ট লিপিতে নবসৃষ্ট ভূমি বলে অভিহিত হয়েছে। ষষ্ঠ শতকে এখানে গড়ে উঠেছিল এক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা। রাজা গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচার দেব এখানে দুই যুগ ধরে রাজত্ব করেছেন। প্রাচীন ঐত্যিহ্যের ধারক এই কোটালীপাড়া ছিল সাহিত্য- সংস্কৃতির এক পাদপীঠ। সংস্কৃত কবি কৃষ্ণ নাথ সার্বভৌম, কবি মধুসূদন সরস্বতী, কবি হরিদাস সিদ্ধান্ত মহাবাগীশ, বিখ্যাত পণ্ডিত রামনাথ সিদ্ধান্ত পঞ্চানন, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রী ড. কালিপদ তর্কাচার্য, আকাশবাণীর ভাষ্যকার সুধীর সমাজপতি, বিচারপতি উমাচরণ রায় চৌধুরী, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ড. ধীরেন সেন, বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের প্রতিষ্ঠাতা সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য, রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার অধ্যাপক চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, সাহিত্যিক রমেশ সেন, বিচারপতি রাজজেন্দ্র সেন. সংগীতজ্ঞ তারাপদ চক্রবর্তী, প্রখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা সতু সেন, কবিরাজ মথুরানাথ সেনগুপ্ত, ফুটবলের রাজা বলাই দে, ফুটবলের ভাষ্যকার সুকুমার সমাজপতি, ওস্তাদ সুধীন লাল চক্রবর্তী, ফার্সি ভাষার পণ্ডিত আবদুর রহমান, ভাষাবিদ ও পঞ্জিকা বিশারদ অনন্ত বিশারদ, লোকনাথ রায় চৌধুরী, উমাকান্ত চৌধুরী, আন্তর্জাতিক চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, সাংবাদিক চপলা কান্ত ভট্টাচার্য, শিল্পী বিজন চৌধুরী, আন্তর্জাতিক চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, সাংবাদিক চপলা কান্ত ভট্টাচার্য, শিল্পী বিজন চৌধুরী, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, খান বাহাদুর হেমায়েতউদ্দিন চৌধুরী, মুন্সী রহিমউদ্দিন, লুৎফুল হক চৌধুরী, ড. কাজী দীন মুহম্মদ প্রমুখ কীর্তিধর পুরুষের সৃষ্টিশীল কর্ম ও মনীষার কোটালীপাড়ার সারস্বত সমাজ আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। বিশেষত বাংলা নাট্যমঞ্চের শ্রেষ্ঠতম প্রয়োগবিদ সতু সেন, ওস্তাদ সুধীন লাল চক্রবর্তী, খেয়ালের জনক তারাপদ চক্রবর্তী প্রমুখ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনন্য কীর্তিমান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ষোড়শ শতকের সংস্কৃত কবি এবং সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম সেরা কাব্য গ্রন্থ ‘ললিত লবঙ্গলতা’ -র রচয়িতা কবি কৃষ্ণনাথ সার্বভৌম এ অঞ্চলের আদি কবি। তাঁর এ কাব্যগ্রন্থখানি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ সমতূল্য। লন্ডন মিউজিয়ামে এর একটি কপি এখনো সংরিক্ষিত অবস্থায় আছে। তাঁর স্ত্রী সরস্বতী দেবীও একজন যশস্বী কবি ছিলেন। কবি হরিদাস সিদ্ধান্ত মহাবাগীশ মহাকবি কালিদাসের অসমাপ্ত মহাকাব্যগুলো সমাপ্ত করেছেন। খ) জেলা শহরের সংস্কৃতি : গোপালগঞ্জ জেলা শহরেও রয়েছে প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দক্ষিণেশ্বরের রাণী রাসমণির স্টেট ছিল খাটরা মৌজায়। রানী রাসমণির নায়েব রজনী কান্ত ঘোষের নাতি নব গোপালের নামানুসারে মধুমতির তীর সংলগ্ন এই স্টেজ ও গঞ্জের নামকরণ হয়- ‘গোপালগঞ্জ’। এরপর থেকে এখানে গড়ে ওঠে এক নগর সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত গোপালগঞ্জ মহকুমায় রূপান্তরিত হলে এখানে নতুন ধারায় সাহিত্য-সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটতে থাকে। ‘করনোনেশান থিয়েটার ক্লাব’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে শহরে শিল্প-সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার শুরু হয়। দেশ বিভাগের পর করনোনেশান থিয়েটার ক্লাবের নাম হয় ‘গোপালগঞ্জ কালচারাল এসোসিয়েশন’। পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘মহকুমা আর্ট কাউন্সিল’ রাখা হয়। এই সংগঠনটিকে কেন্দ্র করেই মূলত শহরে সাহিত্য-সংগীত ও নাট্যকলার বিকাশ ঘটে। প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস, অধ্যাপক রনদা প্রসাদ রায়, অবিনাশ চন্দ্র পাল, রবীন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়, সুরেন্দ্র নাথ সরকার, ডা. কাশেম রেজা, অর্পণা সরকার, মমতা দে, আমজাদ আলী, শহীদ আলী খান, ডা. ফরিদ আহমেদ, আবুল হোসেন ভূইয়া, আবদুস সামাদ খান, ক্ষীরোদ বিশ্বাস, সন্ধ্যা সরকার প্রমুখের ভূমিকায় সংস্কৃতির আঙ্গন হয়ে ওঠে উজ্জ্বল। ষাটের দশকে গোপালগঞ্জ শহরে ‘গোপালগঞ্জ সংস্কৃতি সংসদ’ নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠিত হয়। ঐ সময় তৎকালীন সরকারের নির্দেশে সারাদেশে ‘রবীন্দ্র জয়ন্তী’ পালন নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়। ছাত্র নেতা ওয়ালিউর রহমান লেবু, সুনীল দাস, শওকত চৌধুরীর নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ১৯৩৩ সালে সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে গোপালগঞ্জ কমিউনিটি হলে ‘রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী’ পালনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল মহলের পক্ষ থেকে বাধ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। পরে ম্যাজিষ্ট্রেট কে. সি. দাসের সহায়তায় অনুষ্ঠানটি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়। এভাবেই গোপালগঞ্জ সব সময় অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত থাকে। গ) শ্রীধাম ওড়াকান্দির সাহিত্য-চর্চাঃ প্রায় দু’শত বছর আগে ১৮১১ সালে কাশিয়ানী থানার শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে দলিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের দূত হিসেবে পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ঠাকুর আবির্ভূত হন। এরপর শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক ধারা। শ্রীধাম ওড়াকান্দি থেকে প্রকাশিত হয় ‘মতুয়াদর্পন’, ‘হরিদর্শন’, ‘মতুয়া সৃহৃদ’ প্রভৃতি পত্রিকা। সৃষ্টিশীল সাহিত্য চর্চায় এসব পত্রিকা যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। এ সময় শীমৎ তারক সরকার হরিচাঁদের জীবনীকাব্য ‘হরিলীলামৃত’ রচনা করেন। কাব্যগ্রন্থটি বহুলাংশে কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থের সাথে তুল্য। এছাড়া শ্রী শ্রী অশ্বিনী গোসাই রচিত ‘শ্রী শ্রী হরিসংগীত’ বিরচন পাগলা রচিত ‘গুরুচাঁদ চরিত’ ইত্যাদি গ্রন্থও সাহিত্য ধারার অঙ্গ হয়ে আছে। এছাড়া উলপুর থেকে জমিদার প্রীতিশচন্দ্র বসু রায় চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান গেজেট পত্রিকা উলল্লখযোগ্য। জেলার বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক হযরত মাওলানা শামসুল হক সাহেব ফরিদপুরী (সদর সাব হুজুর) (র.) প্রচলিত সরকারি সহযোগিতা গ্রহণ না করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রায় ৯৫ খানা গ্রন্থ রচনা করেন। ঘ) লোকজ সংস্কৃতি : লোকজ শিল্প সংস্কৃতির সমাবেশে গোপালগঞ্জ জেলা এক ঋদ্ধ জনপদ। এ জনপদে রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এখানে রয়েছে কবি গান, জারি, সারি, নামকীর্ত্তন, পালাকীর্ত্তন, যাত্রা, হরিযাত্রা, রাইযাত্রা, নীল পূজার গান, অষ্টক গান, বয়ানি গান, এচঁড়া পূজার গান, গাজীর গান, তর্জা প্রভৃতি লোকজ সংস্কৃতির উপাদান। শেকড় সন্ধানী লোক-সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হচ্ছে ‘কবি গান’। গোপালগঞ্জে কবি গান বা কবিয়াল সমাজ বেশ খ্যাত। জেলার কৃতিকবিয়াল নকুল দত্ত, রাজেন সরকার নিশিকান্ত সরকার, কালিপদ সরকার, খোকন সরকার, বিনয় সরকার প্রমুখের কবি গান এ অঞ্চলে লোকজ সংস্কৃতির অংশ হিসাবে কবি গানকে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছেন। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অনগ্রসর তৃনমূলের লোকদের মনোরঞ্জনের জন্য এ অঞ্চলে কবি গানের উৎপত্তি ও বিকাশ। যাত্রাশিল্পের বিকাশ ও যাত্রাদল গঠনে গোপালগঞ্জ জেলা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। এ অঞ্চলে ‘রায় কোম্পানি’ নামক প্রাচীনতম যাত্রাদলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহরের বিশিষ্ট যাত্রা সংগঠক বিধু রায়। যাত্রানুরাগী ধীরেন্দ্র কুমার বাগচী গঠন করেছিলেন দীপালি, আদি দীপালি, নব দীপালি প্রভৃতি যাত্রা অপেরা। যাত্রা শিল্পের উৎপত্তি হয় এখানে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও রাই রসরাজ ঠাকুরের সময়ে। দ্রুত এর বিকাশ ঘটে ও চিত্তবিনোদনের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে এখন শিল্পটি বিলুপ্তির পথে। তবে হরিযাত্রা, গুরু যাত্রার প্রচলন অব্যাহত আছে। বয়ানি গান এলাকায় একসময় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এখন আর হয় না। জল-জলা বেষ্টিত জেলা হচ্ছে গোপালগঞ্জ। এখানে সাপের প্রকোপ বেশী এ কারনে বিজয় গুপ্ত রচিত ‘মনষা মঙ্গল’ অনুসারে এ অঞ্চলে সর্প দেবীর বন্দনায় রচিত হয় বয়ানি গানের পালা। এ অঞ্চলে দূর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্ণী পূজা, বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে দশহরার মেলা ও নৌকাবাইচ হয়। নৌকাবাইচে নৌকার চরণদার বৈঠাধারীদের শক্তি যোগাতে একধরণের গান গেয়ে থাকেন। সারি গান হিসাবে এসব পরিচিত। আদিকাল থেকে এখানে নৌকাবাইচের প্রচলন থাকায় ‘সারি গান’ লোক সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হিসাবে বিবেচ্য। এছাড়া চৈত্রসংক্রান্তিতে নীল পূজার সময় নীল পূজার গান এবং অষ্টক গান এখানকার আদি সংস্কৃতি। পৌস মেলাকে কেন্দ্র করে বসে জারি গানের আসর। বিভিন্ন বয়াতিরা জারি গান পরিবেশন করেন উন্মুক্ত মঞ্চে। তর্জা হয় কবি গানের আদলে। নামকীর্ত্তন এ জেলায় প্রাচীন কাল থেকে চালু। মহাপ্রভু চৈতন্যদেব প্রবর্তিত একীর্ত্তন মহানাম কীর্ত্তন নামে প্রচলিত। বিভিন্ন মন্দির, মঠ ও আশ্রমকে কেন্দ্র করে বাৎসরিক আয়োজনে এ কীর্ত্তন হয়ে থাকে এখানে গোড়া থেকেই। এছাড়া পালাকীর্ত্তন বা পদাবলী লোক সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম। প্রায় ২০০ বছর আগে থেকে এ অঞ্চলে পালা কীর্ত্তনের প্রচলন। অভিনয়, কাহিনী, বর্ণনায়, সংলাপ, গান ও নৃত্য দল অংশ নেয়। একজন পদকর্তা থাকেন, তিনি পালার বর্ণনা দেন। এ অঞ্চলে দারুন জনপ্রিয় পালা হচ্ছে নৌকা বিলাস পালা। গোপালগঞ্জে অনেক পালা কীত্তনের দল ছিল। নানা কারনে তা কমে গেছে। এছাড়া রয়েছে জেলার বিভিন্ন সাধক পুরুষের লেখা লোক গান, লোকগীতি। ফটিক গোসাই, আশ্বিনী গোসাই, রাইরসরাজ ঠাকুর প্রণীত গান গ্রামে গ্রামে বৈঠকী গান হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ভাগবতীয় আসরে গীত হয়ে থাকে। যার উৎপত্তি আছে বিলুপ্ত বিকাশ ঘটেনি বা সংরক্ষনের বা সংগ্রহের বা প্রকাশের ব্যবস্থা নেই। ঙ) গোপালগঞ্জের লোক সংগীতঃ অষ্টক গান, নীলের গান, রয়ানি গান বেহুলা ভাষান, মনষার গান, বিয়ের গান, হালোই গান, কবি গান, জারি গান, সারি গান, পঠের গান, বিচার গান, তর্জা, গাজীর গান, মানিক পীরের গান, যাত্রা গান, ত্রিনাথের গান, নামকীর্তন গান, পদাবলী কীর্তন গান, মতুয়া সংগীত বা হরি সংগীত, হ্যাচড়া পূজার গান প্রভৃতি লোকসংগীত গোপালগঞ্জে প্রচলিত ছিলো। তার অনেকটাই বিলুপ্তির পথে এখন। চ) লোক গীতিকারঃ চন্ডী গোঁসাই, শেখ আলী ফকির, অনিল দে, সুকণ্ঠ গাইন, শ্যাম রসিক, কে. এম. চাঁন মিয়া, ধীরেন্দ্র নাথ বালা, মনোজ সাধু, সুনীল রাজবংশী, প্রফুল্ল গোসাই, আশ্বিণী গোসাই, যুগল ঠাকুর, শেফালি বিশ্বাস, অসিত বিশ্বাস, মনোতোষ বিশ্বাস, কার্তিক গোঁসাই, ফটিক গোঁসাই, ক্ষীতিশ গোঁসাই, মাতামচাঁদ গোঁসাই প্রমূখ লোকগীতিকার অসংখ্য গান রচনা ও সুর করে এ অঞ্চলের লোকগীতির ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। ছ) কীর্তনীয়া দলঃ ভাইবোন সম্প্রদায়, দিপুশ্রী সম্প্রদায়, দীপ্তি সম্প্রদায়, যোগমায়া সম্প্রদায়, সীমা সম্প্রদায়, নিত্যানন্দ সম্প্রদায়, কল্পণা সম্প্রদায়, বিশ্ববন্ধু সম্প্রদায়, আদ্যশক্তি সম্প্রদায়, সন্ধ্যারাণী সম্প্রদায়, শেফালি সম্প্রদায়, অনিল সম্প্রদায় প্রভৃতি নামকীর্তন ও পালা কীর্তনের দল এ এলাকায় কীর্তন গানের আসরে বা মহানামযজ্ঞে নাম পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে চলেছে। জ) কবিয়াল সমাজঃ কবিয়াল মনোহর সরকার, নিশি কান্ত সরকার, কালিপদ সরকার, অনাদি সরকার, অসীম সরকার, বিনয় সরকার, স্বপন সরকার, রাজেন সরকার, নারায়ন সরকার, নিখিল সরকার, সঞ্জয় সরকার প্রমূখ কবিয়াল এ এলাকায় কবিগান কে সম্প্রসারিত করেছেন। এ অঞ্চলে লোকজ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে কবি গান বেশ জনপ্রিয়। কবি গান হচ্ছে ‘কবির লড়াই’। ঝ) শিল্পকলা একাডেমি ও সাহিত্য পত্রিকাঃ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্যান্য জেলার মত গোপালগঞ্জেও সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বকীয় ধারা সূচিত হয়। ‘মহকুমা আর্ট কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে প্রথমে ‘শিল্পকলা পরিষদ’ এবং পরে ‘শিল্পকলা একাডেমি’ নামকরণ করা হয়। এই শিল্পকলা একাডেমিকে কেন্দ্র করেই চলতে থাকে সাহিত্য- সংস্কৃতির বিকাশ। পাশাপাশি বেশ কিছু সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনও এখানে গড়ে ওঠে। প্রকাশিত হয় গোলাম কিবরিয়া কয়েছ সম্পাদিত ‘আর্বির্ভাব’ ‘পারাবাত’, খেলাঘরের পক্ষ থেকে ‘খেলাঘর’, ‘রুপালি ফিতে’ প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকা। এসময় অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, আবদুর রসিদ খান ঠাকুর, ডা. কাশেম রেজা প্রমুখ প্রথিতযশা ব্যক্তির উদ্যোগে ‘মধুচক্র’ নামক একটি সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহিত্য সভা করা ছাড়াও ‘মধুচক্র’ নামক একটি পত্রিকা চালু করা হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে। ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ জেলায় রুপান্তরিত হওয়ার পর বিক্ষিপ্ত একক উদ্যোগে ২/১টা সাহিত্য সংকলন প্রকাশ পায়। ১৯৮৬ সালে গোলাম কিবরিয়া কয়েস, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী ও গাজী লতিফ এর উদ্যোগে গঠিত হয় গোপালগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ। যার পরবর্তী সময়ে পাশা খন্দকার, হাবিবুর রহমান, চৌধুরী এমরানুল হাসান, ডা. রমানাথ বিশ্বাস, শেখ মোফাজ্জেল হোসেন, হাবিব উদ্দিন বিশ্বাস, আবদুর রশিদ খান ঠাকুর, ডা. পরিমল সরকার, মশিউর রহমান সেন্টু, হারুন-উর-রশিদ, রেশমা আক্তার হাসি, প্রভাক মুন্নুজান বেগম, অধ্যাপক শ্রী মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, আবদুল মান্নান, প্রভাষক শামীমা পারভীন, মনীষা চৌধুরী, আলীমুজ্জামান টোকন, সুতপা বেদজ্ঞ, নূর ইসলাম খান অসি, জিনাত রসুল, প্রমথ বাগচী, নার্গিস সুলতানা, উৎপল মণ্ডল, রমেন বিশ্বাস, সজল বিশ্বাস, কামরুল হাসান মিলন, আবুল হোসেন ভূঁঞা, এ্যাডভোকেট নূরুজ্জামান খোকন, সাজ্জাদ আহমেদ, শিরিন সুলতানা কলি, ডা. মহসিন রেজা, মনিকা আচার্য, কামরুল হাসান, আকাশ সাহা, হানিফ ফকির, পবিত্র বিশ্বাস, খালেদা খান জেলী, প্রতিক সাইফুল, রূপম রোহান, মাধব সাহা প্রমূখের স্বতঃস্ফূত অংশগ্রহণে নিয়মিত সাহিত্য বাসর অনুষ্ঠানসহ প্রকাশ পেতে থাকে ‘গোপালগঞ্জ সাহিত্যপত্র’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা। পত্রিকাটি বিকাশ মুখীন ও শেকড় সন্ধানী সাহিত্যকর্মী সৃষ্টিসহ দেশীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ জোরালো ভূমিকা রাখে। এতে বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশ পেতে থাকে। প্রায় চার বছর এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। এরপর বিভিন্ন সময়ে মধুমতি সাহিত্যগোষ্ঠি, অরিন্দম সন্ধ্যাতারা, সংশপ্তক, মধুমতি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, অনীক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, সুর সন্ধান শিল্পগোষ্ঠী, দর্পন নাট্য গোষ্ঠী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বিবর্তন শিল্প গোষ্ঠী, অদিতি সাহিত্য-সংগঠন, নন্দন, ত্রিবেনী সংগীত একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, নৃত্যকলা, গীতাঞ্জলি একাডেমি, মধুমতি সাহিত্য-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন, খেলাঘর, কচিকাঁচার মেলা প্রভৃতি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে গোপালগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এসব সংগঠনের কর্মকা- খুব একটা গতিশীল হতে পারেনি। কোনও কোনও সংগঠন দু’একটি অনুষ্ঠান করার পরই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। তবুও এসব সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকাকে খাটো করে দেখা ঠিক নয়। কেননা এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াসের মধ্য দিয়েই হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে-আসবে কোনো অমিত প্রতিভা, যা গোপালগঞ্জের গৌরবকে আরো সুষমামণ্ডিত করবে। ঞ) গোপালগঞ্জের কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীঃ ঢাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালীন উপাচার্য ঐতিহাসিক ড. রমেন চন্দ্র মজুমদার, কবি বিনয় মজুমদার, হাজী নাদের আলী, সেন্ট মথুরনাথ, শের আলী ফকির, সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম, বাকশিল্পী নরেন বিশ্বাস, আসফাউদ্দোলা, অভিনেতা মরহুম খান জয়নুল, কাব্যরত্ন কালিদাস বালা, সাংবাদিক নির্মল সেন প্রমুখ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোপালগঞ্জেরই সন্তান। সংগীত শিল্পী অনিল চন্দ্র দে, এন্ড্রু কিশোর, প্রফুল্ল কুমার বিশ্বাস, জোহেব হাসান, খালিদ হাসান, খালিদ সাইফুল্লা, সাহিত্যিক ধীরেন্দ্র নাথ সরকার, মুন্সী আজিমউদ্দীন, অধ্যাপক মহেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, ডা. কাশেম রেজা, আবদুর রশিদ খান ঠাকুর, অধ্যক্ষ রাখাল ঠাকুর, খোন্দকার এহিয়া খালেদ সাদী, ডা: পরিমল সরকার, কবি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, শেখ মোফাজ্জেল হোসেন, নিপর্না বিশ্বাস, শিব শঙ্কর অধিকারী, সোহেল রহমান, গোলাম কিবরিয়া কয়েছ, গাজী লতিফ, প্রয়াত রেজা পল্টু, শাহনাজ রেজা এ্যানী, অনিল কুমার বিশ্বাস, কে. এম. চাঁন মিয়া, আবৃত্তিকার জি. এম. সিজার, ডাঃ অরুন কান্তি বিশ্বাস, ভবানী প্রসাদ, মোঃ নাজমুল ইসলাম, অধ্যাপক অচিন্ত্য ভৌমিক, জাকির ইবনে সোলাইমান, ছড়াকার খালেক বিন জয়েনউদ্দীন, চিত্ত বিশ্বাস. দীনেশ পাণ্ডে, দীপঙ্কর গৌতম, চয়ন সেন গুপ্ত, কবি নিউটন বিশ্বাস, ‘গণমুক্তি’ পত্রিকা এ্যাড. উৎপল বিশ্বাস, মশিউর রহমান সেন্টু, দেবজ্যোতি ভক্ত, রেশমা আক্তার হাসি, চিত্রশিল্পী সাধন মজুমদার, আলীমুজ্জামান টোকন, গোবিন্দ চন্দ্র দাস, কৃষ্ণ মধু, অচর্না রায় প্রমুখের নাম ঊল্লেখযোগ্য। গোপালগঞ্জ অঞ্চলে যে সমসত্ম লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক উপাদান রয়েছে- তা লালন পালন করে সাংস্কৃতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখা প্রয়োজন। এখানকার সাংস্কৃতিক ধারায় বারবার মঙ্গল বোধের উৎসারন ঘটেছে। লোক সংস্কৃতি ও গণসাংস্কৃতিকে এখানকার সংস্কৃতি কর্মীরা এগিয়ে নিয়ে যাবে- এটাই প্রত্যাশা।