শিল্পকলা একাডেমি, গোপালগঞ্জঃ অতীত ও ভবিষ্যৎ

পরিমল সরকার

বৃটিশ ভারত শাসনামল থেকেই গোপালগঞ্জ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও নাট্য শিল্পে ঐতিহ্য বহন করে আসছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর কয়েকজন উৎসাহী আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক ও ব্যবসায়ী সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘‘গোপালগঞ্জ কালচারাল এসোসিয়েশন।’’ সেকালে করনেশন হল’ই ছিল শহরের একমাত্র নাট্যশালা বা রঙ্গমঞ্চ (যা বর্তমানে রফিক সিনেমা হল নামে পরিচিত)। ১৯৫৯ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ ছায়া ছবির নায়িকা পূর্ণিমা সেন এই ‘করনেশন হল’ (তৎকালীন ইকবাল হল) মঞ্চে ‘কেরাণীর জীবন’ নাটকে অভিনয় করেন। কালচারাল এসোসিয়েশন বিভিন্ন সরকারী অনুষ্ঠান, উৎসব ও জয়ন্তীতে সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান করে গোপালগঞ্জ বাসীদের মনোরঞ্জন করত। কালচারাল এসোসিয়েশনের সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস (মোক্তার)। এ্যামেচার পার্টি নামে এই সংস্থার আর একটি অঙ্গসংগঠন ছিল। তারা শহরের বাইরে প্রায় ডজন খানেক নাটক মঞ্চস্থ করে গ্রামীণ লোকদের আনন্দ দিত। এ্যামেচার পার্টির প্রধান ছিলেন জনাব আমজাদ আলী বিশ্বাস। আইয়ুব আমলে কালচারাল এসোসিয়েশন ‘মহকুমা আর্টস্ কাউন্সিল’ নামে পরিচিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পর জনাব ফরিদ আহমেদ মহকুমা আর্টস্ কাউন্সিলের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে আর্টস কাউন্সিলের দায়িত্ব প্রশাসনের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপর অর্পিত হয়। মহকুমা আর্টস কাউন্সিল পরবর্তীতে মহকুমা শিল্পকলা পরিষদ হয়। সেই সময়ে শিল্পকলা পরিষদের সদস্যদের বসবার বা কোন অনুষ্ঠানের রিহার্সালের জন্য স্থায়ী জায়গা ছিল না । ১৯৭৩ সালে শিল্পকলা পরিষদের একটি টিনের চৌচালা নিজস্ব ঘর তৈরীর পর শিশুদের সঙ্গীত ও নৃত্য শিক্ষার জন্য একটি স্কুল খোলা হয়। সঙ্গীত শিক্ষক ছিলেন শ্রীরমণী মজুমদার ও ওস্তাদ গুরুদাস বিশ্বাস; নৃত্যের শিক্ষক ছিলেন দ্বিজবর বিশ্বাস ও পরবর্তীতে তাহেরা বেগম (লোভা)। ১৯৭৬ সালে শিল্পকলা পরিষদ ‘শিল্পকলা একাডেমি’তে পরিণত হয়। ১৯৭৭ সালের ৩রা এপ্রিল গোপালগঞ্জে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ে শিল্পকলা একাডেমির ঘরটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। শিল্পকলা একাডেমির ঘরের নীচে চাপা পড়ে আহত হন শিল্পকলার সংগঠক ও তবলা শিল্পী শ্রীগোপাল চন্দ্র সাহা, তাহেরা বেগম, জলি, ওস্তাদ গুরুদাস বিশ্বাস ও আজাদ সহ আরো অনেকে। ১৩ই মার্চ ১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমির নতুন ভবন নির্মিত হয়। ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা জেলায় পরিণত হলে একাডেমিটি ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি’ হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯৮৬ সালের আগষ্টে মেজবাহ্ উদ্দিন আহসান এর সম্পাদক হন। সংস্কৃতি কর্মীবৃন্দঃ সেকালে গোপালগঞ্জে যে সব খ্যাতনামা নাট্যশিল্পী ছিলেন তাঁরা হলেন - প্রতাপচন্দ্র বিশ্বাস (মোক্তার), অধ্যাপক অবিনাশচন্দ্র পাল, অধ্যাপক রণদা রায়, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, মনোরঞ্জন সেন (উকিল), রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী (মোক্তার), কালিপদ সান্যাল (তদানীন্তন প্রধান শিক্ষক, বীণাপানি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়), ডা. কুঞ্জবিহারী দে, ডা. গোপালকৃষ্ণ অধিকারী, ডা. অমূল্য ভূষণ চক্রবর্ত্তী, ডা. মনসা, ডা. ফরিদ আহমেদ, ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন, এনামুল কবীর (সার্কেল অফিসার), নূর হোসেন (সহকারী এ্যাডজুট্যান্ট), আতিকুল হক (প্রধান সহকারী, সদর হাসপাতাল), ডাঃ কাশেম রেজা (একাধারে তিনি একজন লেখক এবং খ্যাতনামা অভিনেতা, নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক ছিলেন), সাহিদ আলী খান, আমজাদ আলী বিশ্বাস, নগেন্দ্রনাথ সাহা, গৌরচন্দ্র সাহা, ফকুমিয়া, সামচু মিয়া, এস.এম.হক, অমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস (অনুদা), কুমুদ রঞ্জন চৌধুরী, সুনীল চক্রবর্ত্তী, খোকন বালা, আবদুস ছামাদ খান, অধ্যাপক শ্রী নগেন্দ্রনাথ সাহা, পরেশচন্দ্র বিশ্বাস, কাফু মিয়া, শংকর রায়, প্রতুল মলিস্নক, দুলাল মলিস্নক, গোপালচন্দ্র সাহা, কাজী ওহিদুজ্জামান, হিরম্ন মিয়া, মাধব ও টুটু প্রমুখ। নারী চরিত্রে যারা রূপদান করতেন তাঁরা হলেন - রসিক লাল মল্লিক, সুরেন সাহা, বল্লভ সাহা, শচীন সাহা, দুলালচন্দ্র সাহা, রবীন্দ্রনাথ সাহা প্রমুখ। মহিলাদের মধ্যে হাসিনা নামে একজন মেয়ে সর্বপ্রথম গোপালগঞ্জে মঞ্চে অভিনয় করেন। গোপালগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরো যারা গান কবিতা নাচ ও অভিনয়ে জমজমাট ও মুখরিত করে রাখতেন তাঁরা হলেন - বিল্ববাবু, শৈলেন সাহা, মুকুন্দলাল সাহা, সুনীল রায়, রমণী মজুমদার, নীরোদ বিশ্বাস, অমূল্য কুড়ি, দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস (সাহেব), বরুণ কুমার সরকার, অনিল কুমার বিশ্বাস, ইবনে সাঈদ, গীতা রাণী বিশ্বাস, বিনুরাণী বিশ্বাস, ছায়ারাণী সরকার, সন্ধারাণী সরকার, উত্তরা, অর্পণা সরকার, মমতারাণী দে, দুলালী সরকার, পিলু, রানু, হেনা, রেবা, মিনু, তাতারি, মাখন ঘোষ, গুরুদাস সাহা, সুরেন্দ্রনাথ সরকার, প্রেমানন্দ হালদার, মন্টু রায়, কাশীনাথ বিশ্বাস, ক্ষীরোদ, সন্তোষ ঘোষ (তবলায়)। সন্তোষ কুমার ঘোষ পরে ঢাকা বেতারে প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী মান্না মেহেদী নামে সু-পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে পপশিল্পী খালিদ স্বাধীনতার পর গোপালগঞ্জে মূলধারার গানই করতেন। নিপর্ণা বিশ্বাস (নজরুল পরিষদের সম্মাননাপ্রাপ্ত), প্রতিভা কুন্ডু, অনিল বিশ্বাস (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী), বরুণ সরকার, বীরেণ সাহা, ইবনে সাইদ, আরজু, বৈজু একসময় সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গানে ভরিয়ে রেখেছেন। তবলায় গোপাল সাহা, শিবশঙ্কর অধিকারী, শিবশংকর বসু, তপন সরকার, ভবানী বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে সংগত করেছেন বা এখনো করছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরো দুজন শিল্পী হলেন কোটালীপাড়ার অনিল দে এবং ডা. ফরিদ আহমদ-এর তৃতীয় ছেলে শহীদ হাসান শেখ। এখানে দুইজন বিশেষ ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করতে হয়। তিনি হলেন মরহুম খোন্দকার সামচুদ্দিন আহমেদ (উকিল) ও অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। তাদের নিজেদের সময়ে গোপালগঞ্জে যে সমস্ত নাট্যানুষ্ঠান বা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে সব তাদের সক্রিয় সহযোগিতা, উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। তাদের উপস্থিতি ছাড়া কোন অনুষ্ঠানই যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠত না। মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস নাটক লিখে বঙ্গবন্ধু কলেজে অভিনয় করাতেন, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। ২ মানুষের কল্পনা ও প্রায়োগিক দক্ষতা দিয়ে সৃষ্ট কর্মের সৌন্দর্য বা আবেগ যদি অন্যের মধ্যে ভাললাগার অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে পারে - তাই শিল্প। শিল্প দৃষ্টিগ্রাহ্য (চিত্রকর্ম), শ্রুতিগ্রাহ্য (সংগীত) বা হাতে তৈরি বস্ত্ত (ভাস্কর্য, হস্তশিল্প) হতে পারে। অন্যের মধ্যে ভাল লাগা ছড়িয়ে দেয়ার আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন এবং সহজাত। ‘মানুষের মন চায় মানুষের মন’। অন্যের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া বা বেঁচে থাকার এই ইচ্ছে থেকেই শিল্পের সৃষ্টি। শিল্প মনের আহার। শরীরের বেঁচে থাকতে হলে খাবারের দরকার। মনের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজন শিল্প সাহিত্যের। যে দেহ খাবার, তা যত অল্পই হোক, খেতে পারে না - সে দেহ মৃত। তেমনি যে মনের শিল্প সাহিত্যের প্রয়োজন হয় না সে মন মৃত। খাদ্যে যেমন শরীরের বৃদ্ধি ঘটে, শিল্প-সাহিত্য তেমনি মনের বৃদ্ধি ঘটায়। দেহ না বাড়লে মানুষ খর্বকায় হয়ে থাকে। মন না বাড়লে মনও খর্বমন থেকে যায়। শিশু শরীরে শিশুমন মানায়, কিন্তু পূর্ণ বয়স্ক মানুষ শিশুর আচরণ করলে মানুষ বিরক্ত হয়। মনের বৃদ্ধি বলতে বোঝায় প্রসারতা- মনের প্রসারতা বা বিশালতা। সোজা কথায় মন বড় হওয়া। মন বড় হলে মনের ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। মন কূপমণ্ডুক থাকে না। কূপকেই সাগর বলে আনন্দে ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ বলে চেঁচায় না। একটা আধুলী পেয়েই রাজার সম্পদ পেয়েছি বলে তার উপরে বসে থাকে না। একটা বইয়ের মধ্যে পৃথিবীর সব জ্ঞান নিহিত বলে সবকিছু থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে রাখে না। আমাদের সাড়ে তিন হাত শরীরের জন্যে সাড়ে তিন হাত উঁচু ঘর যথেষ্ট নয়। আলো বাতাসের জন্যে হাত পা খেলানোর জন্যে আরো জায়গা চাই, দরজা জানলা চাই। মনের বেঁচে থাকার জন্যেও তেমনি বড় ঘর চাই, তার দরজা জানালা চাই। শিল্পকলা-সাহিত্য সেই দরজা জানালা, যেখান দিয়ে মন আলো হাওয়া পায়, বেঁচে থাকার অক্সিজেন পায়। তাই শিল্পকলা একাডেমির মূল দায়িত্বই হলো সব ক’টা জানালা খুলে দেওয়া। শিল্পকলা একাডেমি, গোপালগঞ্জ, তার ঘরের দরজা-জানালা খোলা শুরু করেছে। শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার চর্চা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছে। আগে শিল্পকলা একাডেমি তার সুনির্দিষ্ট শিল্পীদের দিয়ে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতো। এখন এর বাইরের শিল্পীদের অংশগ্রহণের আহবান জানাচ্ছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজিত হচ্ছে যেখানে অন্যান্য সংগঠন অংশগ্রহণ করছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি। এর মাধ্যমে শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমের চর্চা বাড়ছে। গত বছর শিশুশিল্পী বাছাই করে গান রেকর্ডের ব্যবস্থা হয়েছে। সংগীত, নৃত্য, নাটকের জন্যে ঢাকা থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। প্রযোজনাভিত্তিক নাটক ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এ বছর রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন স্কুলে আয়োজিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের জন্যে শিল্পীদল গঠন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা এই প্রথমবার আয়োজিত হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে নিয়মিত গুণী সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে। নানা বাধা বিঘ্নের মধ্য দিয়ে এই অগ্রগতি। শিল্পকলা একাডেমির কার্যনির্বাহী কমিটি ও জেলা কালচারাল অফিসার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এগুলো করতে পেরেছেন। কিন্তু গোপালগঞ্জ এখনো শিল্পচর্চায় একটি পশ্চাদপদ জেলা। মানে, পরিমানে এখনো অনেক জেলার তুলনায় পিছিয়ে। অর্থাৎ মানুষের মনের জানালা অতটা খোলেনি। কেন খোলেনি, কেন পিছিয়ে আছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে পদক্ষেপ নেয়াও একাডেমির কাজ হওয়া উচিৎ। এই জেলার পিছিয়ে থাকার কারণ বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা থেকে একেবারে আলাদা তা নয়। তবে মাত্রায় আলাদা বটে। কি কি কারণে শিল্পচর্চায় আমরা পিছিয়ে, তার প্রতিকারই বা কি তা একটু ভেবে দেখা যেতে পারে। ১। সামাজিকঃ শিল্পচর্চা ছেলে-মেয়ে হিন্দু-মুসলমান ধনী-গরীব ভেদ টানে না। ছেলে মেয়ে একসাথে ওঠা বসা করলে অভিভাবকরা চিহ্নিত থাকেন কখন তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা পরিসংখ্যান নিয়ে দেখেন না শিল্প সাহিত্য চর্চা ছাড়াই শতকরা কত ছেলে মেয়ের মধ্যে দৈহিক মানসিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। মোবাইল ইন্টারনেট বরং এক্ষেত্রে আরো বেশি ভূমিকা রাখছে। সামাজিক এইসব যোগাযোগ মাধ্যমে ঘরে বসেই রক্ষণশীল পরিবারের ছেলেমেয়েরা বরং বেশি অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। শিল্পচর্চা বরং ছেলে মেয়ের মধ্যে সুস্থ মানবিক সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। কিছু পরিবার ওই একই কারণে বিভিন্ন ধর্মের এবং বিভিন্ন আয়ের লোকের মধ্যে মেলামেশা পছন্দ করে না। তাই তারা শিল্পচর্চা থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখে। সাম্প্রদায়িকতা মানুষকে অসম্পূর্ণ করে রাখে, খণ্ডিত করে রাখে, সম্পূর্ণ মানব হতে দেয় না। অসাম্প্রদায়িক উৎসবের চর্চা বাড়িয়ে মানবতার দিকে এগিয়ে চলা যেতে পারে। শিল্প সাহিত্যের মাধ্যমেই ধনী গরীব কাছে আসতে পারে। একে অপরকে বুঝতে পারে। শ্রেণী বৈষম্য কমানোর দিকে এক পা হলেও এগোতে পারে। সমাজে স্থিতিশীলতার জন্যে, শান্তির জন্যে যা একান্ত প্রয়োজন। ২। প্রাতিষ্ঠানিকতাঃ বেশির ভাগ পরিবারই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই চরম শিক্ষা বলে মনে করে। বেশি উপার্জনই যখন জীবনের মোক্ষ তখন উপার্জনক্ষম হবার বিদ্যাই অভীষ্ট। শিল্পকলার চর্চা তাই অযথা সময় নষ্ট বলেই এসব পরিবারের ধারণা। দেহের ভোজের মধ্যেই তাদের আনন্দ। মনের উন্নত ভোজ যে প্রয়োজন, এই উপলব্ধি পর্যন্ত নেই। সৃজনশীলতা বা সৃষ্টিশীলতার আনন্দ থেকে তারা একেবারেই বঞ্চিত। সৃষ্টিশীলতার আনন্দ উপলব্ধি করানোর জন্যে প্রথমদিকে তাদের অনুষ্ঠান বা প্রদর্শনীতে উপস্থিত করার জন্যে যথাযথ ব্যক্তি মারফৎ বার বার তাগিদ দেয়া যেতে পারে। একবার শিল্পের মূল্য বুঝতে পারলে পরে নিজেরাই চর্চা শুরম্ন করতে পারে। আজকাল প্রতিভাবান শিল্পীরা না খেয়ে মরার অবস্থায় নেই। বরং খ্যাতি ও অর্থ দুইই আসতে পারে শিল্পচর্চা থেকে। ৩। ধর্মীয়ঃ অনেক সময় ধর্মকে শিল্পচর্চার বাধা বলে মনে করা হয়। ধর্মে গানবাজনা নেই, ছবি আঁকা নেই, ধর্মীয় বই ছাড়া অন্য বইয়ের কথা সত্য নয় - ইত্যাদি ধারণা শিল্পচর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ চিমত্মা ভাবনা দূর করে শিল্পে আগ্রহী করে তোলা খুবই কঠিন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং অন্যান্য বই পাঠের মাধ্যমে এসব কুসংস্কার দূর করা যায়। এই পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার জন্যে শিল্পকলা একাডেমি অন্যান্য প্রতিযোগিতার সাথে বইপাঠের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে। নিজ ধর্মসহ অন্যধর্মগুলি সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থ থেকে সরাসরি জানতে পারলে সাম্প্রদায়িকতা, ফতোয়াবাজি এবং কুসংস্কার থেকে ছেলেমেয়েরা মুক্ত হতে পারে। তা না হলে অন্যের দেয়া ফতোয়ায় জীবনকে তারা বেঁধে ফেলতে বাধ্য। উপর্যুক্ত বিষয়গুলি ছাড়াও শিল্পচর্চা বাড়ানোর জন্যে আরো কিছু বিষয় ভাবতে হবে। যেমনঃ ঘরোয়াভাবে ছোট ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজনঃ এসব ছোট অনুষ্ঠানে শ্রোতা-দর্শক হিসেবে একই ব্যক্তিবর্গকে প্রতিবার আমন্ত্রণ না করে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীকে আমন্ত্রণ জানানো দরকার - কখনো ছাত্র ছাত্রী, কখনো শিক্ষক, কখনো শ্রমিক প্রতিনিধি, কখনো রাজনৈতিক নেতা, কখনো ব্যবসায়ী ইত্যাদি। অল্প নির্দিষ্ট সংখ্যক আমন্ত্রিত হলে শ্রোতারা সম্মানিত মনে করেন, উপস্থিতির হার বাড়ে। শিল্পকলা যে বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাতে অনেক সময় প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে স্কুলের শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিত করতে হয়। আয়োজকরা আশা করে অনেক দর্শক আসুক, কিন্তু ব্যস্ত শুধু প্রশাসনের লোকদের আপ্যায়ন নিয়ে। শিল্পকলা একাডেমির সব সদস্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শ্রোতাদের একটু মৌখিক আপ্যায়ন করলেও ধীরে ধীরে শ্রোতা বাড়বে, চর্চা বাড়বে। আয়োজনে সময়নিষ্ঠ হতে হবেঃ প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথির জন্যে মানুষ ঘন্টা ঘন্টা অপেক্ষা করতে পারে না। যদি মনে করি অনুষ্ঠান সাধারণের জন্যে তাহলে সময়মত অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে। দুই একজনের কারণে শ্রমঘন্টা নষ্ট হয় বলে মানুষ অনুষ্ঠানে আসতে অনাগ্রহী হয়। সাংসারিক কাজ ও পড়াশুনা ফেলে মানুষ ৪/৫ ঘন্টা নষ্ট করতে পারে না। সময়মত অনুষ্ঠান হলে বেশি দর্শক উপস্থিত হবে। অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে হবেঃ মানুষ টিভি ইন্টারনেট ছেড়ে কেন অনুষ্ঠানে আসবে যদি মান ভাল না হয়? ভাল করতে হলে সময় নিয়ে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করে ভালভাবে মহড়া করতে হবে। গতানুগতিকতার বাইরে অনুষ্ঠান সাজাতে হবে। জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানগুলো খুব হেলা ফেলা করে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচককে দুই/তিন দিন আগে জানানো হয়। তাই আলোচনা ভাল করার সুযোগ থাকে না। ৫/৭ দিন আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সভা হয়। অন্তত ২/৩ মাস আগে সভা করে কে কি করবে তা ঠিক করে দেয়া উচিত। সৃজনশীল, প্রজ্ঞা ও মেধাসম্পন্ন ব্যাক্তিদের একাডেমিসংলগ্ন করতে হবেঃ কোন কাজই রাজনীতিবর্জিত নয়। শিল্পীদেরও রাজনীতি সচেতন হতে হয়। কিমত্মু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রমে যুক্ত করা সমীচীন নয়। রাজনীতি ও শিল্পজ্ঞান সম্পন্ন মুক্তমনা মানুষেরই এসব দায়িত্বে থাকা উচিত। বাজেট বাড়াতে হবেঃ অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করতে মঞ্চসজ্জা, আলো, শব্দ, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজন। মহড়া বা অনুষ্ঠানে শিল্পীদের সামান্য নাসত্মার বরাদ্দও অনেক সময় থাকে না। অথচ তাদের আসা যাওয়ার খরচটা অন্তত দেয়া দরকার। এসবের জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। আরো অনেক বিষয় আছে। একথাগুলোই শেষ কথা নয়। এর মধ্যেও বিতর্ক থাকতে পারে। সবারই ভাবতে হবে, কিভাবে আমাদের জেলায় শিল্পচর্চা আরো বাড়ানো যায়, কিভাবে তার মান আরো উঁচুতে নেওয়া যায়। সহায়ক গ্রন্থঃ আবুল হোসেন ভূইঞার গোপালগঞ্জের ইতিহাস